বিশ্ব ডিম দিবস একটি অতি সুপরিচিত দিবস। বাংলাদেশের ভোক্তাগন এই দিবস এবং ডিমের গুরুত্ব উপস্থাপনে এই দিনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে পেরেছে বলেই প্রতিবছর এই দিবস পালনের পরিধি বাড়ছে। বাংলাদেশে আজকের এই অবস্থায় আসার জন্য পাড়ি দিতে হয়েছে সূদীর্ঘ ৮ টি বছর।
৮ বছর পূর্বে ২০১৩ সালের ১১ অক্টোবর বাংলাদেশে প্রথম পালিত হয় এই দিবসটি। যদিও এর ১৮ বছর পূর্বে ১৯৯৬ সালে ইন্টারন্যাশনাল এগ কমিশন প্রথম ভিয়েনায় পালন করে বিশ্বের প্রথম ডিম দিবস। সিদ্ধান্ত হয় প্রতি বছর অক্টোবর মাসের দ্বিতীয় শুক্রবারে ইন্টারন্যাশনাল এগ কমিশনের নেতৃত্বে সারা বিশ্বে পালিত হবে “বিশ্ব ডিম দিবস”। ২০২১ সালের ৮ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী পালিত হয় ‘২৫ তম বিশ্ব ডিম দিবস” অর্থাৎ এ বছর এই দিবসটির সিলভার জুবীলি।
বাংলাদেশ এনিমেল এগ্রিকালচার সোসাইটী (BAAS) ইন্টারন্যাশনাল এগ কমিশনের বাংলাদেশ প্রতিনিধি নিযুক্ত হয় এবং এই সংগঠনটি বাংলাদেশে প্রথম পালন করে “বিশ্ব ডিম দিবস ২০১৩”। পরবর্তীতে প্রতিবছর অক্টোবর মাসের দ্বিতীয় শুক্রবারে এই বিশেষ দিবসটি পালন করে আসছে। ইন্টারন্যাশনাল এগ কমিশন (IEC) এবং জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থা (FAO) একে অন্যের সাথে আন্তর্জাতিক সহায়তার সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে একে অন্যকে সহায়তা করে থাকে এবং জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থা প্রত্যেক দেশে স্থানীয় পর্য্যায়ে ইন্টারন্যাশনাল এগ কমিশনের প্রতিনিধিকে সহায়তা করে।
২০১৪ সাল থেকে এই সংস্থাটি বাংলাদেশ এনিমেল এগ্রিকালচার সোসাইটী এবং ইন্টারন্যাশনাল এগ কমিশনের সাথে যৌথ ভাবে প্রতি বছর পালন করে ‘বিশ্ব ডিম দিবস”। প্রাথমিক পর্য্যায়ে বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যাক্তি এই দিবসটি পালনের গুরুত্ব অনুধাবন করতে না পারলেও পরবর্তীতে বাংলাদেশ এনিমেল এগ্রিকালচার সোসাইটীর পাশাপাশি সরকারী-বেসরকারী সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান গুলি নিজেরাও এই দিবস পালন করছে, যার কলেবর প্রতি বছর বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এই দিবসটির দুটি মৌলিক উদ্দেশ্য হচ্ছে ভোক্তাকে ডিমের গুনাগুন তুলে ধরে সচেতন করার মাধ্যমে ডিম গ্রহন মাত্রা বৃদ্ধি করা এবং একই সাথে সাশ্রয়ী মূল্যে ডিমের সরবরাহের উদ্দেশ্যে খামারীকে মানসম্মত ডিম উৎপাদনে উদ্বুদ্ধ করা। বাংলাদেশে এই উদ্দেশ্য অত্যন্ত সফল। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এবং গনমাধ্যমের সক্রিয় সহযোগীতায় ডিম সম্পর্কে ভোক্তা সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে, ২০১৩ সালে বাংলাদেশে জনপ্রতি ডিম গ্রহন ছিল মাত্র ৩৭ টি যা মাত্র ৮ বছরে দাঁড়িয়েছে জনপ্রতি প্রায় ১০৫ টিতে। ২০১৩ সালে ডিম উৎপাদন ছিল মাত্র ৬০০-৭০০ কোটি ডিম, যা ২০২১ এ উন্নীত হয়েছে প্রায় ২০০০ কোটি ডিম। উন্নয়ন ঘটেছে ডিমের মানের, বর্তমানে উৎপাদিত হচ্ছে ওমেগা ডিমের মত বিশেষায়িত ডিম, প্যাকেটে সুপের স্টোরে গ্রেডিং করা ডিম। ভবিষ্যতে ডিম উৎপাদন যেমন বৃদ্ধি পাবে, তেমনি মানেরও উন্নয়ন ঘটবে নিশ্চিত।
২০১৩ সাথে ডিম গ্রহনমাত্রার কমের ৩টি মূল ভ্রান্ত ধারনা দায়ী ছিল। প্রথমতঃ ডিমে ক্ষতিকারক কোলেস্টেরল আছে, তাই চল্লিশোর্ধ কেউ ডিম গ্রহন করতো না। দ্বিতীয়তঃ ডায়াবেটিক রোগীদের ডিম খেতে নিষেধ করা হতো। তৃতীয়তঃ শিশুদের ডিম খেতে বারন করা হতো, কারন ভ্রান্ত ধারনা ছিল ডিম খেলে শিশু মোটা হয়ে যায়। বিশ্ব ডিম দিবস পালন কালে ডিমের নানা সঠিক তথ্য উপস্থাপনার মাধ্যমে সকল পক্ষকে সচেতন করার উদ্যোগ গ্রহন করা হয়। গনমাধ্যম ব্যাক্তিত্বদের দায়িত্বশীল এবং সক্রিয় অংশগ্রহনের মাধ্যমে ভোক্তা সচেতনতা বৃদ্ধি পায় এবং ভ্রান্ত ধারনাগুলি দূরীভূত হয়। বর্তমানে সকল বয়সী জনসাধারন নিয়মিত ডিম খায়, ডায়াবেটিকস রোগী, শিশু এবং প্রসূতি নিয়মিত ডিম খেয়ে থাকে।
ডিম একটি পূর্নাংগ একক খাদ্য, যাতে থাকে সহজপাচ্য আমিষ, ভিটামিন এবং মিনারেলস। ভিটামিন ডি এর প্রাকৃতিক উৎস, ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স, কোলিনের মত মহামূল্যবান ভিটামিন আছে। প্রতিদিন একটি ডিম একজন পূর্ন বয়স্ক মানুষের দৈনিক ভিটামিন ও আমিষ চাহিদার একটি বড় অংশ পূরনে সক্ষম।
মেধাবী জাতি গঠনে ডিমের গুরুত্ব অপরিসীম। সহজলভ্য এবং ক্রয়ক্ষমতার আয়ত্বের মধ্যে ডিম একটি ‘সুপার ফুড’, তাই ২৫ তম বিশ্ব ডিম দিবসের প্রতিপাদ্য “আজ ডিম খান এবং প্রতিদিন ডিম খান”
লেখকঃ মোঃ মোরশেদ আলম, কৃষিবিদ ও সভাপতি, বাংলাদেশ এনিমেল এগ্রিকালচার সোসাইটী ( BAAS)

Be the first to comment