তরমুজের দাম: বয়কট নয়, দরকার সমন্বিত সমাধান

সাইদুল ইসলাম

এবারে রোজার মাসে দেশে আলোচনার বড় ইস্যু তরমুজ। রোজায় তরমুজ নিয়ে যত আলোচনা হয়েছে আমার মনে আর কোনো ইস্যু নিয়ে এতো আলোচনা হয়নি। রোজার মাসে যেহেতু তরমুজের একটা আলাদা চাহিদা থাকে তাই সেই মাসে বাজার অস্থির হলে মানুষের ক্ষোভটা বেশি হওয়াই স্বাভাবিক। যার ফলাফল এখন দেখা যাচ্ছে তরমুজের বাজারে । আড়তে আড়তে হাজার হাজার তরমুজ পড়ে আছে নেয়ার পাইকার নাই। আবার রাস্তার মোড়ে  মোড়ে তরমুজ  নিয়ে হাটছেন ভ্যানে বিক্রেতারা। পাড়ার মোড়ে মোড়ে ফলের দোকানগুলোতেও এখন সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছে তরমুজ। কিন্তু সেভাবে কিনছেনা মানুষ। এখন ভালো মানের ছয়-সাত কেজি ওজনের তরমুজও পায়া যাচ্ছে মাত্র ১২০ থেকে ১৫০ টাকায়। যে তরমুজ রোজার শুরুতে ছিল ৮০ থেকে ৯০ টাকা কেজি সেই তরমুজ এখন কোথাও কোথাও মাত্র ২০ টাকা কেজিতেও বিক্রি হচ্ছেনা। কেজিতে বিক্রিও বন্ধ হয়ে গেছে। কেনো এমন পরিস্থিতি হলো। শুধু কি মানুষের বয়কটের ডাকেই এমন পরিস্থিতি? নাকি আরো কারণ আছে। ক্রেতা  আর বাজারের এই আচরণে কি প্রভাব পড়বে আগামী দিনে তরমুজ চাষে?

তরমুজ খুবই সুস্বাদু গ্রীষ্মকালীন ফল। যদিও এখন সারাবছরই কমবেশি বিভিন্ন জাতের তরমুজ চাষ হয়। তবে, দেশের উপকুলীয় কয়েকটি জেলাসহ বিভিন্ন জেলায় তরমুজের চাষ তিন থেকে চারগুন বেড়েছে গত এক দশকে। উন্নত জাতের বীজের কারণে উৎপাদনও বাড়ছে প্রতি বছর।

সাধারণত জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে তরমুজের চাষ শুরু হয়। কিন্তু এবার রমজানকে সামনে রেখে বিভিন্ন জেলায় ডিসেম্বর থেকেই তরমুজের চাষ শুরু করেন কৃষকরা। যেহেতু বীজ বপনের ৯০ দিনের মধ্যে ফলন আসে, তাই ডিসেম্বরে চাষ শুরু করায় মার্চের শুরুতেই তরমুজ বিক্রির উপযুক্ত হয়ে উঠে এবার। ফলে এবারে রোজার ঠিক আগে আগেই নতুন তরমুজ আসতে শুরু করে বাজারে। কিন্তু তরমুজের বেসামাল দামে সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে যায় মৌসুমি এই ফলটি।  রোজার মাসে ক্রেতাদের জিম্মি করে ব্যবসায়ীদের দাম বাড়ানোর এমন আচরণ ক্ষুব্ধ করে মানুষকে। অনেকেই স্যোসাল মিডিয়ায় পোস্ট দিয়ে কিছু দিনের জন্য তরমুজ বয়কটের আহবান জানান। দ্রুত এই ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে মানুষের মাঝে। তরমুজ কেনা থেকে অনেকেই বিরত হযে যান। কারণ একটা ১০ কেজি ওজনের তরমুজ ৮০০ টাকায় কিনে খাওয়ার অবস্থা কতজনের আছে তা মাথায় রাখেনি ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট। বাজারে কমতে থাকে তরমুজের বিক্রি।

এরপর মরার ওপর খড়ার ঘা হযে আসে দফায় দফায় বৃষ্টি। তার ওপর ঠান্ডা আবহাওয়া। সাধারণত চড়া রোদ ও গরম থাকলেই তরমুজের চাহিদা বাড়ে বাজারে। কিন্তু এবারে রোদ বা গরম খুব বেশি ছিলনা পুরো রমজান জুড়েই। ফলে বিপাকে পড়ে কৃষক ও তরমুজ ব্যবসায়ীরা। শিলাবৃষ্টি আর ঝড়ের শংকায় ক্ষেত থেকে তরমুজ তুলে ফেলছেন কৃষক ও ব্যাপারীরা। ফলে বাজারে একসাথে আসে বিপুল পরিমান তরমুজ। তাই এখন তরমুজ নেয়ার মানুষ নেই।

দেশের অন্যতম বড় তরমুজের হাট মুন্সিগঞ্জের মুক্তারপুর। সেই আড়তে গিয়ে দেখা গেছে, আড়তের সামনে তরমুজের সারি সারি স্তুপ। আড়ৎগুলোতে তিল ধারণের স্থান নেই। আড়তের সামনে আনলোড করার অপেক্ষায় ১০-১২টি ট্রাক। পাশের ধলেশ্বরী নদীতে কযেকটি ট্রলার ভর্তি তরমুজ।  প্রতিরাতে উপকুলীয় জেলাগুলো থেকে তরমুজ আসছে। কিন্তু তরমুজ কেনার খুব কম পাইকারই চোখে পড়ে। একই পরিস্থিতি ঢাকার বিভিন্ন আড়তেও।

কৃষক ও পাইকাররা বলছেনগত ৪-৫ দিন আগে সামান্য শিলা বৃষ্টি হয়েছে। শিলা বৃষ্টি হলে তরমুজ সাধারণত নষ্ট হয়ে যায়। তাছাড়া প্রতিদিনই কমবেশি ঝড়ো বৃষ্টি হচ্ছে। তাই কৃষক ভয়ে তরমুজ তুলে বিক্রির চেষ্টা করছেন। এতে বাজারে প্রচুর তরমুজ উঠছে। যার কারণে দাম অনেক কমে গেছে।অনেক কৃষককেই দেখা যাচ্ছে তরমুজ চাষ নিযে হতাশা প্রকাশ করছেন।

অথচ এই তরমুজরে বাজারটা যদি স্বাভাবিক আচরণ করতো তাহলে মানুষও রোজায় ইফতারে একটি দেশি ফল মন ভরে খেতে পারতো আর কৃষককেও এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতোনা। রোজার শুরুতেই অতি মুনাফালোভি ব্যবসায়ীরা যদি তরমুজ ৫০-৬০ টাকা কেজিতেও বিক্রি করতো তারপরও মানুষ কিনতো। বয়কট করতোনা। ফলে রোজার শুরুতে বাজারে প্রচুর তরমুজ যেমন আসতো, বিক্রি স্বাভাবিক থাকতো, কৃষক ও ব্যবসায়ী সবাই কমবেশি লাভ পেতেন।

এখন এই তরমুজ বয়কটের প্রভাবটা কি হবে? তরমুজ সাধারণত কৃষকরা দুইভাবে বিক্রি করেন । প্রথমত যখন তরমুজ মোটামুটি বড় হযে যায় তখন ক্ষেত চুক্তি বিক্রি করে দেন। এভাবে যারা বিক্রি করেছেন সেইসব কৃষকরা কিছুটা ভালো দাম পেয়েছেন। তারা খুশি। কিন্তু যেসব কৃষক তরমুজ পরিপক্ক করে শ হিসেবে বিক্রি করতে রেখেছিলেন তারা এবার বড় লোকসানে পড়েছেন। কারণ তাদের বিক্রির সময়টা যখন হয়েছে তখন বাজারে তরমুজের দাম পড়ে গেছে অস্বাভাবিকভাবে।

এখন যেসব কৃষক এবার তরমুজের বড় আকারে লোকসানে পড়েছেন তিনি সামনের বছর চাষ করার জন্য আর আগ্রহ পাবেন না। যেসব ব্যবসায়ী ধরা খেয়েছেন তারা সামনের বছর আর এই ব্যবসা করতে চাইবেন না। ফলে এই দুইয়ের প্রভাব পড়বে আগামী বছরের উৎপাদনে।

এবারে আসি বয়কট ও কিছু ভ্রান্ত ধারণা প্রসঙ্গে। যারা বয়কটের ডাক দিলেন তাদের বেশিরভাগেরই টোনটা ছিল যত সস্তায় পায়া যায়। একটি দেশের নাগরিক হিসেবে এই মানসিকতাটা মোটেও ইতিবাচক নয়। একটা ফল আমাদের দেশের কৃষক তার শ্রমে-ঘামে সুদে ঋণ নিয়ে উৎপাদন করছে। এখন আমাদের মানসিকতা যদি হয় আমি ১০ কেজির তরমুজ ১০০ টাকায় কিনবো সেটাও ন্যায্য নয়। তরমুজের ক্ষেতে কি পরিশ্রম আর কষ্ট তা যারা চাষ করে তারাই জানে। তারওপর এটা এমন ফসল যা লটারির মত। একটা শিলাবৃষ্টি হলেই সব শেষ করে দেয় চোখের পলকে। তাই কৃষকদের টিকে থাকার বিষয়টিও ক্রেতাদেরই মাথায় রাখতে হবে।

সবচেয়ে দু:খজন বিষয হলো পুরো বিষয়টাতে সরকারের কৃষি বিভাগের কোনো ভূমিকাই চোখে পড়লোনা। ফসলটার বাজার ঠিক করা, চাহিদা, সরবরাহ, কৃষকদের পাশে দাড়ানো কোথাও চোখে পড়লোনা কৃষি বিভাগকে। অথচ সবচেয়ে বড় দায়িত্ব তারাই নিতে পারতো। একবার ভাবুনতো তরমুজ না থাকলে তার বিপরীতে কি পরিমান বিদেশি ফল আমদানি করতে হতো। কত পরিমান বৈদেশিক মুদ্রা যেতো এই ডলার সংকটের সময়ে।

তাই, সবার কাছে অনুরোধ বয়কট অনেক হয়েছে। ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটকে শায়েস্তা করতে গিয়ে আমরা কৃষককে শায়েস্তা করে ফেলছি কিনা ভাবার সময় এসেছে। এখন তরমুজের দাম একেবারেই কম। তাই আপনারা তরমুজ কিনুন, কৃষককে বাঁচান। কৃষকরা অভিমানি হয়ে গেলে আমরা হয়তো ফলটাই পাবোনা। আর তরমুজ পুষ্টিমানে গরমের দিনে খুবই কার্যকর ফল। তাই বেশি করে তরমুজ খান। কৃষক বাঁচুক, দেশ বাঁচুক আমরাও বাঁচি।

সাইদুল ইসলাম 

সাংবাদিক (বিশেষ প্রতিনিধি, জিটিভি )

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*