অতিরিক্ত গরম আর লোডশেডিংয়ের কারণে অনেক খামারে মারা যাচ্ছে মুরগি। সাথে দফায় দফায় পোল্ট্রি খাদ্যের দাম বাড়ায় বিপাকে পড়েছেন খামারিরা। এতে কমছে উৎপাদন লোকসানে ব্যবসা ছাড়তে হচ্ছে অনেক খামারিকে।
ময়মনসিংহ সদর ও তারাকান্দা উপজেলার বিভিন্ন খামার ও খামার মালিকদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। একই চিত্র দেশের অনেক জেলায়।
ময়মনসিংহ প্রাণিসম্পদ অফিস সূত্র জানায়, জেলায় নিবন্ধিত মুরগির বাণিজ্যিক খামারের সংখ্যা ৪৩৮টি। অনিবন্ধিত পাঁচ হাজারেরও বেশি। জেলায় নিবন্ধিত লেয়ার মুরগির খামার ৩১৫টি, অনিবন্ধিত চার হাজার ৭৮৩ টি। নিবন্ধিত কক মুরগির খামার ৩৭টি, অনিবন্ধিত এক হাজার ২১৩ টি। এছাড়াও নিবন্ধিত হাঁসের খামার ৬১টি ও অনিবন্ধিত এক হাজার ৬৫টি।
জেলার তারাকান্দা উপজেলার পশ্চিম কামারিয়া গ্রামের সালসাবিল পোল্ট্রি ফার্মের মালিক নয়ন মিয়া। তিনি প্রথম উত্তর ময়মনসিংহে লেয়ার মুরগি পালন শুরু করেন। অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের কারণে গরমে মুরগি মারা যাওয়া, খাদ্যের দাম বৃদ্ধিতে গত ৬ মাস ধরে প্রতিদিনই লোকসান হওয়ায় খামার ছেড়ে দেওয়ার চিন্তা করছেন নয়নি মিয়া। ২০০৭ সালের ২০০ লেয়ার মুরগি দিয়ে একটি টিন শেডে ব্যবসা শুরু করলেও এখন ৪টা শেডে আড়াই হাজার মুরগি আছে তার।
তিনি বলেন, করোনাকালে দফায় দফায় খাদ্যের দাম বৃদ্ধি ও বর্তমান সময়ে অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের কারণে গত ২০ দিনে অন্তত ১৩০টা মুরগি মারা গেছে। মুরগিকে নিয়মিত আলোতে রাখতে হয়। এ লোডশেডিংয়ে ঠিক মতো আলোর সরবরাহ করতে না পারায় ডিম উৎপাদন অর্ধেকে নেমেছে। খাদ্যের দাম বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন খরচও অনেক বেশি।
ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের সবজিপাড়া এলাকার ব্রহ্মপুত্র এগ্রো কমপ্লেক্সের মালিক আনিসুর রহমান প্রিন্স বলেন, আমার পাঁচ হাজার লেয়ার মুরগির খামার ছিল। গত রোজার ঈদের আগে হঠাৎ বার্ড ফ্লু রোগে আক্রান্ত হয়ে সব মুরগি মারা যায়। ওই সময় খামারের আশপাশের প্রায় সব মুরগিই মারা যায়। এখন গরুর খামার আছে। এটা নিয়ে কোন মতে চলছি।
লেয়ার মুরগি লালনপালন করবেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, বর্তমানে বাজারে যে হারে খাবারের দাম বেড়েছে। এখন যদি ব্যবসা করি, তাহলে লাভের মুখ দেখতে পারব না।
সদর উপজেলার দাপুনিয়া গ্রামের খামারি আনোয়ার পারভেজ বলেন, পোল্টি মুরগির একটা বাচ্চা আমাদের কেনা পড়ে ৩৫ থেকে ৪২ টাকায়। তারপর খাবার খাইয়ে বড় করতে হয়। দিনে চার ঘণ্টাও বিদ্যুৎ থাকে না। এখন লোডশেডিংয়ের কারণে জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে। ডিজেলের দাম লিটারে বেড়েছে ৩৪ টাকা। এখন ব্যবসা না পারতেছি ছাড়তে না পারছি ধরে রাখতে।
একই উপজেলার আলালপুর এলাকার মিলন পোল্ট্রি ফার্মের মালিক সোয়েব হোসেন বলেন, গত সাত বছর যাবত গরু, ফিশারি ও লেয়ার মুরগি লালনপালন করে আসছি। আমাদের দুটি টিন শেডে চার হাজার ২০০ মুরগি ছিল। সম্প্রতি লোডশেডিংয়ের কারণে প্রায় এক হাজার ২০০ মুরগি মারা গেছে। এতে প্রায় সাত লাখ টাকার মত লোকসান হয়েছে।
তারাকান্দার কামারিয়া এলাকার মো. হালিম মিয়া বলেন, ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করতাম। কিন্তু ওই পেশায় এখন তেমন সম্মান নেই। তাই চাকরি ছেড়ে ৬ বছর ধরে লেয়ার মুরগি লালনপালন করে আসছি। গত কয়েকদিনের গরমে প্রায় দেড় শতাধিক মুরগি মারা গেছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ ওয়াহেদুল আলম বলেন, পোল্টি খামার একটি ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসা। তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে খামার ক্ষতিগ্রস্ত হবে এটা স্বাভাবিক। খামারে এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলে মুরগি স্ট্রোক করে। তাতে অনেক খামারে মুরগি মারা যাচ্ছে। প্রান্তিক পর্যায়ে অনেক খামারি আমাদের না জানিয়ে মুরগি পালন ছেড়ে দিচ্ছেন। তাই এর সঠিক হিসাব পাওয়া যাচ্ছেনা।
এদিকে, অতিরিক্ত গরম আর লোডশেডিং এর প্রভাব পড়েছে গাজীপুর, নরসিংদী, সাভারসহ ঢাকার আশপাশের অনেক এলাকায়। লোকশানের আশংকায় অনেক খামারি ব্যবসা ছেড়ে বিকল্প পেশার চিন্তা করছেন।

Be the first to comment