আনারস কেনো খাবেন: আনারসের পুষ্টিগুন ও উপকারিতা

এখন বাজারে প্রায় সারাবছরই পাওয়া যায় ছোট-বড় নানা আকারের আনারস। রসালো ও তৃপ্তিকর সুস্বাদু ফল হিসেবে আনারসের পরিচিত দীর্ঘদিনের ও বিশ্ব্যাপী। ফলটিতে আঁশ ও ক্যালোরি ছাড়াও প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস এবং পটাশিয়াম থাকে। কলস্টেরল ও চর্বিমুক্ত বলে স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এর জুড়ি নেই। আজ আসুন জেনে নিই আনারসের পুষ্টিগুন ও  উপকারিতা সম্পর্কে।

খাদ্য উপাদান: ১)ভিটামিন ‘এ’, ২)ভিটামিন ‘সি ‘, ৩)ক্যালসিয়াম, ৪)পটাসিয়াম, ৫)ফসফরাস, ৬) বিটা কেরোটিন, ৭) ব্রোমলিন -যা হজম শক্তি বাড়ায়।

পুষ্টি উপাদান : পুষ্টিবিদদের মতে প্রতি ১০০ গ্রাম তরতাজা খাবার উপযোগী আনারসে পুষ্টি উপাদান নি¤œরূপ: জলীয় অংশ ৯২.৪, খনিজ পদার্থ ১৩.১২ গ্রাম, খাদ্যশক্তি ৪৮ কিলোক্যালরি, শর্করা ১২.৬৩ গ্রাম, চিনি ৯.২৬ গ্রাম, আঁশ ১.৪ গ্রাম, চর্বি ০.১২ গ্রাম, প্রোটিন ১ গ্রাম, ভিটামিন সি ৪৭.৮ মিলিগ্রাম, ভিটামিন এ ১৮৩০ মাইক্রোগ্রাম, ভিটামিন বি-১ ০.১৮ মিলিগ্রাম, বি-২ ০.০৫ মিলিগ্রাম, বি-৬ ০.১১০ মিলিগ্রাম, ক্যালসিয়াম ১৮ মিলিগ্রাম, লৌহ ১.২ মিলিগ্রাম, নিয়াসিন ০.৪৮৯ মিলিগ্রাম, প্যান্টোথেলিক এসিড ০.২০৫ মিলিগ্রাম, ফলেট ১৫ মাইক্রোগ্রাম, ম্যাগনেসিয়াম ১২ মিলিগ্রাম, ম্যাঙ্গানিজ ০.৯২৭ মিলিগ্রাম, ফসফরাস ৮ মিলিগ্রাম, পটাসিয়াম ১১৫ মিলিগ্রাম, জিংক ০.১০ মিলিগ্রাম, আনারসের জাত, জন্মস্থান, জলবায়ু ইত্যাদি পরিবর্তনের সাথে সাথে পুষ্টিমানের কিছুটা পরিবর্তন হতে পারে।

কি কি উপকার করে আনারস

পুষ্টির অভাব পূরণ করে

পুষ্টিগুণে ভরপুর ফলের নাম আনারস। এতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ এবং সি, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম ও ফসফরাস রয়েছে। এসব অপরিহার্য উপাদান আমাদের দেহের পুষ্টির অভাব পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।

হজমশক্তিকে  বৃদ্ধি করে:

আমাদের হজমশক্তি বৃদ্ধি করতেও আনারসের জুড়ি নেই। আনারসে ব্রোমেলিন নামক এনজাইম থাকে যা হজমশক্তিকে উন্নত করতে সাহায্য করে। তাই বদহজম বা হজমজনিত যে কোনো সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে আনারস খাওয়া যেতে পারে।

ভাইরাসজনিত ঠাণ্ডা ও কাশি প্রতিরোধ করে:

আনারসে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি থাকায় তা ভাইরাসজনিত ঠাণ্ডা ও কাশি প্রতিরোধে ভুমিকা রাখে। তাছাড়া জ্বর ও জন্ডিস প্রতিরোধে আনারস বেশ উপকারী। এছাড়া নাক দিয়ে পানি পড়া, গলাব্যথা এবং ব্রংকাইটিসের বিকল্প ওষুধ হিসাবে আনারসের রস খেতে পারেন।

শরীরের ওজন কমাতে সহায়তা করে:

আনারসে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার বা আঁশ থাকে। এছাড়া এতে কোন ফ্যাট না থাকায় পরিমিত পরিমানে আনারস খেলে বা আনারসের জুস পান করলে তা শরীরের ওজন কমাতে সহায়ক হতে পারে। আনারস তাই আপনার ওজন নিয়ন্ত্রণের পথ্য হতে পারে। দেহে রক্ত জমাট বাঁধতে বাধা দেয় এই ফল। ফলে শিরা-ধমনির মধ্য দিয়ে সারা শরীরে সঠিকভাবে রক্ত প্রবাহিত হতে পারে।

দাঁত ও মাড়ি সুরক্ষায় কাজ করে:

আনারসে ক্যালসিয়াম থাকায় তা দাঁতের সুরক্ষায় কাজ করে। নিয়মিত আনারস খেলে দাঁতে জীবাণুর সংক্রমণ কম হয় ফলে দাঁত ঠিক থাকে। এছাড়া মাড়ির যে কোনো সমস্যা সমাধান করতে আনারস বেশ কার্যকর ভূমিকা পালন করে।

চোখের যত্নে আনারস ব্যবহার হয়:

আনারস চোখের রেটিনা নষ্ট হয়ে ধীরে ধীরে অন্ধ হয়ে যাওয়া রোগ “ম্যাক্যুলার ডিগ্রেডেশন”রোগটি হওয়া থেকে আমাদের রক্ষা করে। আনারসে রয়েছে বেটা ক্যারোটিন। প্রতিদিন আনারস খেলে এ রোগ হওয়ার সম্ভাবনা ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। ফলে সুস্থ থাকে আমাদের চোখ।

ত্বকের যত্নে আনারস:

আনারসে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ক্যালরি থাকে যা আমাদের শক্তির যোগান দেয়। এতে থাকা প্রোটিন ত্বকের মৃত কোষ দূর করে, ত্বককে কুঁচকে যাওয়া থেকে বাঁচায়। এছাড়া দেহের তৈলাক্ত ত্বক, ব্রণসহ সব রূপলাবণ্যে আনারসের যথেষ্ট কদর রয়েছে।

হাড়ের সমস্যাজনিত রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে:

আনারসে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম থাকে যা হাড়ের গঠনে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এছাড়া এতে থাকা ম্যাঙ্গানিজ হাড়কে করে তোলে মজবুত। তাই খাবার তালিকায় পরিমিত পরিমাণ আনারস রাখলে হাড়ের সমস্যাজনিত যে কোনও রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।

ক্রিমিনাশক হিসেবেও কাজ করে:

ক্রিমিনাশক হিসেবে আনারসের রস ভালো কাজ করে। নিয়মিত আনারসের রস খেলে কয়েকদিনের মধ্যেই কৃমির উৎপাত বন্ধ হয়ে যায়। কৃমি দূর করতে সকালবেলায় ঘুম থেকে জেগে খালি পেটে আনারস খাওয়া উচিত।

ক্যান্সার প্রতিরোধী:

ফ্রি-রেডিকেল বা মুক্ত মুলক মানবদেহের কোষের উপর বিরূপ ক্রিয়ার সৃষ্টি করে ফলে ক্যান্সার এবং হৃদরোগের মত মারাত্মক রোগ দেখা দিতে পারে। দেশী আনারসে আছে উচ্চ মাত্রায় পানিতে দ্রবনীয় অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ভিটামিন-সি এবং পানিতে দ্রবনীয় অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যা দেহকে ফ্রি-রেডিকেল বা (মুক্ত মুলক) থেকে সুরক্ষা প্রদান করে। ফলে ক্যান্সার এবং হৃদরোগের মত মারাত্মক রোগ দেহে বাসা বাঁধতে বাধাগ্রস্থ হয়।

আনারসের কিছু পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়াও রয়েছে

আনারসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ উপকারিতা থাকলেও এটি সবার জন্য ঠিক স্যুট করে না। অনেকেরই আনারস এলার্জির সমস্যা যেমন বিভিন্ন ধরনের চুলকানি, ফুস্কুরি ইত্যাদি হতে পারে।

আনারসে রয়েছে প্রচুর পরিমানে প্রাকৃতিক চিনি যা ডায়বেটিস রোগীদের জন্য ক্ষতিকর। আনারসের মধ্যে অতিরিক্ত চিনি আমাদের দেহে রক্তের চিনির পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। তাই ডায়াবেটিস রোগীরা আনারস বেশি না খেয়ে সপ্তাহে ২ দিন খেতে পারেন।

আনারস একটি এসিডিক ফল। তাই খালি পেটে ফলটি খেলে পেটে প্রচন্ড ব্যথা তৈরী হতে পারে। আনারস আর দুধ এক সাথে খাওয়া যায় না, এটি একটি কুসংষ্কার। এখন পর্যন্ত আনারস এবং দুধের মাঝে এমন কোন রাসায়নিক বিক্রিয়া খুঁজে পাওয়া যায়নি যার ফলে এদেরকে এক সাথে খেলে সেটা মানুষের জীবনহানি করবে। বর্তমানে অনেক খাবারেই দুধ ও আনারস একসাথে মেশানো হয় এবং সারা বিশ্বেই তা খাওয়া হয়।

কোন গ্যাস্ট্রিকের রোগী যদি খালিপেটে আনারসের সাথে দুধ খায় তাহলে তাঁর পেটে প্রচন্ড ব্যথার “ফুড ট্যাবু” এর উদ্ভব হতে পারে।

রক্ত তরল করার জন্য যে ওষুধ বানানো হয় তাতে আনারস ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এই ফল দেহে রক্ত জমাট বাঁধার প্রক্রিয়াতে বাঁধা প্রদান করে থাকে। তাই যাদের আনারস খেলে এ সকল সমস্যায় ভুগেন তারা অবশ্যই আনারস থেকে দূরে থাকবেন।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*