সরিষা চাষের বোনাস পাওনা মধু। কর্মসংস্থান হচ্ছে অনেকের

সরিষার চাষ করলে সাথে বোনাস পাওনা মধু। সরিষা ক্ষেতের পাশে মৌ মাছির খামার করলে একদিকে মিলছে মধু অন্যদিকে সরিষার ফলনও বেড়ে যায় ১৫ থেকে ২০ ভাগ। ফলে সরিষার মৌসুমে উত্তরাঞ্চসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বাড়ছে সরিষার চাষ। বাড়ছে মৌমাছির খামার।

চলতি মওসুমে রাজশাহী এবং বগুড়া অঞ্চলের ৭ জেলায় ৩ লাখ ৫০ হাজার ৭৬৯ হেক্টর সরিষা খেতে প্রায় ২ হাজার মেট্রিকটন মধু উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।

উত্তরাঞ্চলের আটটি জেলায় বেড়েছে সরিষা আবাদ। বিস্তৃর্ণ বিলের যতদূর চোখ যায় হলুদের সমারহ। বাক্স থেকে বেরিয়ে হলুদ ফুলের ডগায় বসে মধু আহরণ করছে মৌমাছির দল। এভাবে গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য হারে সরিষা আবাদের সাথে পাল্লা দিয়েছে বেড়েছে মৌমাছির খামার।

সরিষার ফুল কাজে লাগিয়ে খেতের আইলে শত শত মৌবাক্স বসিয়ে বাণিজ্যিকভাবে মধু উৎপাদন করছেন মৌয়ালরা। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে উত্তরাঞ্চলের মধু যাচ্ছে দেশের সব জেলায়। বিভিন্ন বেসরকারি কোম্পানির কাছেও বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে এই মধু।

কৃষি অধিদপ্তরের রাজশাহী ও বগুড়া আঞ্চলিক অফিসের হিসেব মতে, ২১-২২ মওসুমে বগুড়া অঞ্চলের জয়পুরহাট, বগুড়া, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলায় ১ লাখ ২৬ হাজার ৪৪৭ হেক্টর সরিষা খেতে মধু উৎপাদন হয় ৪ লাখ ২২ হাজার ২৪৩ কেজি। ২২-২৩ মওসুমে মধু উৎপাদন হয় ১ লাখ ৯৪ হাজার ৭৮৪ কেজি। আগের দুই বছরের তুলনায় চলতি মওসুমে ৬৮ হাজার ৩২৭ হেক্টর জমিতে বেড়েছে সরিষার আবাদ। একইসঙ্গে মধু উৎপাদন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৫ হাজার ৭৭৭ কেজি। সব মিলিয়ে এই অঞ্চলে এবার ১ লাখ ৯৪ হাজার ৭৮৪ হেক্টর জমির সরিষায় ১ হাজার ১০০ মেট্রিকটন মধু উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।

এ ছাড়া রাজশাহী অঞ্চলের রাজশাহী জেলায় চলতি মওসুমে ৭৭ হাজার ৩৫০ হেক্টর সরিষার জমি থেকে মধু আহরণ লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৮৬ হাজার ৫৪০ কেজি। এই জেলায় ২০২৩ মওসুমে ৪২ হাজার ৫৫৩ হেক্টরে মধু উৎপাদন হয় ৪৯ হাজার ৮৮৫ কেজি এবং ২২ মওসুমে ২৬ হাজার ১৫৬ হেক্টরে মধু উৎপাদন হয় ২১ হাজার ২৭৭ কেজি। হিসেব মতে, চলতি মওসুমে নওগাঁ জেলায় ১ লাখ ২০ হাজার ৪৬০ কেজি, আগের মওসুমে ১৬ হাজার ৮০ কেজি, ২২ মওসুমে ৩২ হাজার ৭৩০ কেজি এবং চলতি মওসুমসহ গত তিন বছরে নাটোর জেলায় মধু উৎপাদন হয়েছে ৩৪ হাজার ১৬৫ কেজি মধু উৎপাদন হয়েছে। কৃষি বিভাগের রেকর্ড অনুযায়ী, এই অঞ্চলে গত তিন বছরে ১৬ হ্জাার ৩৩৭ হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদ বেড়েছে। মধু উৎপাদন বেড়েছে ৬১ হাজার ৭৩৭ কেজি।

দেখা যায়, নাটোর,সিরাজগঞ্জ,বগুড়া আর পাবনায় বিস্তৃত চলনবিলের সরিষার  খেতে শত শত মৌবাক্স বসানো। প্রতিটি ছোট দলে অন্তত ৫ জনকে শ্রমিক মধু সংগ্রহের কাজ করছেন। মৌমাছির দল সরিষা ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে চাষির বাক্সে জমা করছে। মধু আহরণ, সংরক্ষণসহ নানমুখী কাজে ব্যস্ত থাকতে দেখা গেছ মৌয়ালদের।

মধু সংগ্রহ প্রক্রিয়া

কাঠ দিয়ে বিশেষ কায়দায় মধু সংগ্রহের বাক্স তৈরি করা হয়। রোদ-বৃষ্টিতে মাছির মধু সংগ্রহ অব্যহত থাকে। কালো রঙের পলিথিন ও পাটের চটে বাক্সগুলো মুড়িয়ে রাখা হয়। বাক্সে মৌমাছির অবাধ চলাচলের জন্য পথ রয়েছে। বাক্সে বিশেষ কৌশলে রানী মৌমাছিকে আটকে রাখা হয়। মূলত রানীর টানেই অন্য মাছি মধু সংগ্রহ করে বক্সে ফিরে। প্রতিটি মৌবাক্সে ৭ থেকে ১০টি কাঠের ফ্রেমে মধু সঞ্চয় করে মাছির দল।

বছরের ছয়মাস বাক্সের মাধ্যমে মধু সংগ্রহ করেন তারা। অন্য সময় চিনির রস খাইয়ে মৌমাছি রাখা হয়। পরে রবি মওসুমে এসে সরিষা, লিচু, বড়ই, কালোজিরা, ধনিয়া ফুলে মধু উৎপাদন হয়। এর মধ্যে সরিষা এবং কালোজিরার মধুর চাহিদা বেশি।

সব ঠিক থাকলে সরিষা মৌসুমে একশ বাক্স থেকে সপ্তাহে ৩০০ থেকে ৩২০ কেজি মধু সংগ্রহ করা যায়। বর্তমানে খুচরা পর্যায়ে মাণভেদে প্রতি কেজি মধুর দাম ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা। তবে পাইকারদের কাছে কম দামে মধু বিক্রি করতে হচ্ছে।

অনেক চাষি অভিযোগ করে বলেন, তারা সরিষা খেত থেকে মধু উৎপাদন করছেন ঠিকই কিন্তু কাঙ্খিত দাম পাচ্ছেন না। বছরের ডাল সময়ে প্রায় ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকা ব্যয় হয় মৌমাছি ধরে রাখতে। অথচ মওসুমে মধু উৎপাদন করে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা কেজি পাইকারি দরে বিক্রি করতে হচ্ছে। পাইকারি পর্যায়ে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায় বিক্রি করতে পারলে মৌচাষে ব্যাপক সম্ভাবনা তৈরি হতো।

বর্তমানে একটি সম্ভাবনাময় খাত হলো মৌ চাষ। মধুকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে ক্ষতিকর সাদা চিনির প্রতি মানুষের ঝোক কমবে। পাশাপাশি কর্মসংস্থা হবে বহু যুবকের।

 

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*