এই ভরা শীতে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলায় তরমুজ চাষ করে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে চাষীরা। বদলে যাচ্ছে হাওড়ের ফল-ফসলের ধরণ। এই উপজেলায় এবছর তরমুজের বাম্পার ফলন হওয়ায় খুশি চাষিরা। তরমুজের বাম্পার ফলনের পাশাপাশি জেলা সদরের সাথে এই উপজেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হওয়ায় ন্যায্য মুল্যে তরমুজ বিক্রি করতে পারছেন চাষিরা।
এই উপজেলার চাষিরা টানা কয়েক বছর ধরে হাওরে আমন ধানের পরিবর্তে তরমুজ চাষ করছেন। আর এতে হাওরের চিত্র অনেকটাই পাল্টে গেছে। দূর থেকে সবুজ মাঠে তরমুজ নয়ন কাড়ে।
সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার বাদাঘাট ইউনিয়নের লামাশ্রম, জাঙ্গালহাটি, বিন্নাকুলি, মোদেরগাঁও, করিমপুর ও পুটিয়া এলাকার ২৫০ হেক্টর জমিতে তরমুজের চাষ হয়েছে। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসের এই সময়ে অন্যান্য স্থানে তেমনভাবে তরমুজ না উঠলেও তাহিরপুর থেকে তরমুজ ভর্তি ট্রাক প্রতিদিন সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ মৌলভীবাজার এবং কিশোরগঞ্জে যাচ্ছে।
তাহিরপুরের তরমুজ চাষিরা জানান, গ্লোরি.জাম্বু, ওরিয়ন, বাংলালিংক, ড্রাগনসহ বিভিন্ন জাতের তরমুজ চাষ করেছেন। এ বছর শীতকালীন পোকা থেকে তরমুজ বিভিন্ন কীটনাশক দিয়ে রক্ষা করতে পারায় তরমুজের ফলন ভালো হয়েছে। সেই সাথে সুরমা নদীর উপর ‘আবদুজ জহুর’ সেতু হওয়ায় ব্যবসায়ীরা সরাসরি ক্ষেত থেকে ক্রয় করতে পারছেন তরমুজ। এতে তরমুজের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন কৃষকরা। তারা জানান, ধানের বিকল্প তরমুজ চাষ অনেক লাভজনক।
তরমুজ চাষিদের সাথে কথা বলে জানা যায়, চলতি বছর তাহিরপুর কৃষি অফিসের প্রযুক্তিগত সহায়তায় তরমুজ ফলনে ব্যাপক সাফল্য অর্জিত হয়েছে। প্রতি একরে ২০-২৫ হাজার টাকা খরচ করে আনুমানিক ৪ হাজার তরমুজ উত্পাদিত হয়। যার বিক্রয় মূল্য ৩-৪ লাখ টাকা। এ বছর ব্যাপক আকারে তরমুজ চাষ ও দ্বিগুণ ফলনে কৃষকেরা যেমন লাভবান তেমনি ব্যবসায়ীরাও। তাহিরপুর কৃষি বিভাগের উপ-সহকারী কৃষি অফিসার শামসুল ইসলাম জানান, উন্নত প্রযুক্তি সহায়তার ফলে তরমুজ উৎপাদনে আগের চেয়ে বর্তমানের খরচ কমে এসেছে।
এ বছর শহরাঞ্চলের ব্যবসায়ীদের উপস্থিতি বেশি। যদিও ঠান্ডাজনিত কারণে কোনো কোনো ক্ষেত্রে উত্পাদন সামান্য পরিমাণে কমেছে। তবে মারাত্মক কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়নি বলে জানান কৃষি কর্মকর্তা। তিনি বলেন, কৃষকরা ছিলেন সচেতন ও আন্তরিক। তরমুজ রোপণ ও ফলনের সময় টিএসপি, এমওপি, সুপার জিপসামসহ অন্য সার ব্যবহার করা হয়। ছত্রাকনাশক, ও কীটনাশক ব্যবহারের জন্য কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ দেয়া হয়। চাষিদের মতে চলতি বছরে সময় মতো হাইব্রিড জাতের বিভিন্ন বীজ পাওয়ায় ফলন বেশি হয়েছে।
কৃষকদের অভিযোগ- কয়েক বছর পূর্বে কৃষি বিভাগের উপ-পরিচালক ড. আফসারুজ্জামান এ হাওরে এসে তরমুজ চাষিদের ফলনের সুবিধার্থে সরকারিভাবে সেচ ব্যবস্থার আশ্বাস দিলেও এর অগ্রগতি নেই। তাহিরপুর উপজেলার বাদাঘাট ইউপি’র সাবেক চেয়ারম্যান ও তরমুজ চাষি নিজাম উদ্দিন জানান, সময়মতো নানান জাতের হাইব্রিড বীজ পাওয়ায় ও প্রাকৃতিক কোনারূপ প্রতিবন্ধকতা না থাকায়, এ বছর তরমুজের ফলন ভালো হয়েছে। বিপণও কোনো অসুবিধা হয়নি। তিনি বলেন, সেচ সুবিধাসহ অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত হলে তাহিরপুর হতে পারে তরমুজের উত্পাদনের মডেল।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুনামগঞ্চের বিস্তীর্ন এলাকাসহ অন্যান্যা এলাকায় আগাম জাতের এই তরমুজ চাষকে জনপ্রিয় করা গেলে একদিকে যেমন ফলের চাহিদা পুরণ হবে অন্যদিকে এখান বিপুল সংখ্যক কৃষি পরিবারও অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে।

Be the first to comment