ধান কেনায় অনিয়ম, দীর্ঘসূত্রিতা ও হয়রানি দূর করে প্রকৃত কৃষকের কাছ থেকে ন্যায্যমুল্যে ধান কিনতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রান্তিক কৃষকদের স্বার্থ সংরক্ষণে চালু করা হচ্ছে ‘ডিজিটাল খাদ্য সংগ্রহ ব্যবস্থাপনা ও কৃষক অ্যাপ’। এর মাধ্যমে কৃষকরা ঘরে বসেই জানতে পারবেন সরকারি গুদামে ধান বিক্রির জন্য তিনি নির্বাচিত হয়েছেন কি না?
মোবাইল ফোনে নিবন্ধন করার পরে অ্যাপ থেকেই জানা যাবে, কোন গুদামে কী পরিমাণ ধান বিক্রির সুযোগ আছে। ধান বিক্রির টাকাও চলে যাবে কৃষকের হাতে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে। নিবন্ধনের পর শুধু একবারই ধান বিক্রি করতে নির্ধারিত খাদ্য গুদামে যেতে হবে কৃষককে।
নিবন্ধন ও আবেদনের নিয়ম
‘কৃষকের অ্যাপ’ ব্যবহারের জন্য শুরুতেই স্মার্টফোনে অ্যাপটি ডাউনলোড করতে হবে। এর পর জাতীয় পরিচয়পত্র ও মোবাইল নম্বর দিয়ে নিবন্ধন সম্পন্ন করতে হবে। নিবন্ধনের দিন থেকেই কৃষক ধান বিক্রির আবেদন করতে পারবেন। প্রথমবারের মতো শুরু হওয়া ডিজিটাল মাধ্যম কৃষকের অ্যাপে নিবন্ধনের শেষ তারিখ ৭ ডিসেম্বর। ধান বিক্রির আবেদনের শেষ তারিখ ১৫ ডিসেম্বর। এ বিষয়ে কৃষক সার্বিক সহযোগিতা পাবেন কাছের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ও ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের উদ্যোক্তাদের কাছে। আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত কৃষকের তালিকা তৈরি হবে লটারির মাধ্যমে। এর পর সংশ্নিষ্ট উপজেলায় ক্রয় লক্ষ্যমাত্রা ও কৃষকের সংখ্যার ভিত্তিতে উপজেলা সংগ্রহ ও মনিটরিং কমিটি ধান কিনবে।
তবে অভ্যন্তরীণ খাদ্যশস্য সংগ্রহ নীতিমালা ২০১৭ অনুযায়ী একজন কৃষকের কাছ থেকে সর্বনিম্ন ১২০ কেজি (তিন বস্তা) এবং সর্বোচ্চ তিন টন (সাড়ে ২৭ মণে এক টন ধরা হয়) ধান কেনা যাবে। কৃষকের ধানের মূল্য তার নিজস্ব ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে পরিশোধ করা হবে। প্রথম পর্যায়ে ১৬ জেলার ১৬টি উপজেলায় শুরু হচ্ছে এ কার্যক্রম। এ জন্য সংশ্নিষ্ট জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), কৃষি কর্মকর্তা, খাদ্য নিয়ন্ত্রক ও উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা, খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ প্রতি উপজেলায় আট কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে খাদ্য অধিদপ্তর।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এতে কৃষক ধানের ন্যায্য মূল্য পাবেন। চলতি আমন মৌসুম থেকেই খাদ্য অধিদফতর এই ‘ডিজিটাল খাদ্য সংগ্রহ ব্যবস্থাপনা ও কৃষক অ্যাপ’ চালু করতে যাচ্ছে। এরই মধ্যে সব কার্যক্রম শেষ হয়েছে। এখন চলছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সমন্বিত প্রশিক্ষণ। এতে উপজেলা প্রশাসন, কৃষি বিভাগ, খাদ্য বিভাগ ও ব্যাংক কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের (বিসিসি) তৈরি করা অ্যাপটি পরীক্ষামূলকভাবে চলতি মৌসুমে দেশের আটটি বিভাগের ১৬টি জেলার উপজেলা সদরে চালু করা হবে। আগামী বোরো মৌসুমে এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তারা।
আমন মৌসুমে সাধারণত শুধু চাল সংগ্রহ করা হয়। ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে এবার কৃষকদের কাছ থেকে রেকর্ড পরিমাণ ধান সংগ্রহ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারি খাদ্য সংগ্রহ অভিযানে অনিয়ম ও প্রকৃত কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনার ক্ষেত্রে ফড়িয়া মূল বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অ্যাপ ব্যবহারে কৃষকরা সরাসরি সরকারি সংগ্রহ অভিযানে অংশ নিতে পারবেন। এসব বিবেচনায় রেখে এবার ডিজিটাল পদ্ধতিতে ধান কেনার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
নিবন্ধিত নামের তালিকা থেকে লটারির মাধ্যমে কৃষক নির্বাচন করা হবে। এরপর ক্ষুদে বার্তার মাধ্যমে নির্বাচিতদের জানানো হবে কোন খাদ্যগুদামে তারা কী পরিমাণ ধান বিক্রি করতে পারবেন। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে কৃষকদের ধানের দাম পরিশোধ করা হবে।
প্রথমে যেসব এলাকায় অ্যাপ ব্যবহার করা হবে
প্রত্যেক বিভাগের দুটি জেলা থেকে দুটি উপজেলায় অ্যাপ ব্যবহার করা হবে। এগুলো হলো— বগুড়া ও নওগাঁ সদর, সাভার ও গাজীপুর সদর, ময়মনসিংহ ও জামালপুর সদর, কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর, বরিশাল ও ভোলা সদর, রংপুর ও দিনাজপুর সদর, যশোর ও ঝিনাইদহ সদর এবং মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ সদর।
এ বিষয়ে খাদ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. নাজমানারা খানুম কৃষি জীবনকে জানান, প্রকৃত ও প্রান্তিক কৃষকদের স্বার্থ সংরক্ষণ ও তাদের উৎপাদিত ধানের মূল্য নিশ্চিত করতে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কৃষকরা যেন ধানের আর্দ্রতা নিয়ে সমস্যায় না পড়েন, সে জন্য খাদ্য বিভাগ ও কৃষি বিভাগের কাছে থাকা মিটারের সঙ্গে আরও তিনহাজার মিটার কেনা হচ্ছে। কৃষকদের কাছে অ্যানড্রয়েড মোবাইল ফোন না থাকলে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার বা কৃষি বিভাগের মাঠ পর্যায়ে কর্মকর্তারা তাদের সহায়তা দেবেন বলেও জানান এই কর্মকর্ত।
তিনি জানান, ‘মিলারদের কাছ থেকে চাল ও গম সংগ্রহেও অ্যাপ ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। এ বিষয়ে প্রচারণার জন্য লিফলেট বিতরণ, মাইকিং ও হাটবাজারে সংশ্লিষ্ট উপজেলায় গম্ভীরা দল পাঠানো হচ্ছে। পাশাপাশি স্টেক হোল্ডারদের সঙ্গেও বৈঠক করা হবে।’
খাদ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা জানান, চালকল মালিকদের সিন্ডিকেটের কারণে কৃষকদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ ওঠে প্রতি বছর। সে জন্য এখন কৃষকের কাছ থেকে চালের বদলে সরাসরি ধান কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ধীরে ধীরে সারাদেশে অ্যাপের মাধ্যমে প্রকৃত কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনা হবে। সরকার গত বছর চালকল মালিকদের কাছ থেকে ৮ লাখ টন চাল কিনেছিল। আর চালকল মালিকরা ধান কিনেছিল কৃষকের কাছ থেকে। কিন্তু চালকল মালিকদের সিন্ডিকেটের কারণে ধানের ন্যায্য দাম না পেয়ে কৃষকরা দেশের বিভিন্ন জায়গায় রাস্তায় ধান ফেলে প্রতিবাদ করেছিলেন। অতীতের পরিস্থিতি বিবেচনা করে এবার সরকার চাল কেনার লক্ষ্যমাত্রা অনেক কমিয়ে এনেছে। অ্যাপের মাধ্যমে প্রকৃত কৃষকের কাছ থেকে চাল কেনার উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারের হিসাবে প্রতি কেজি আমন ধান উৎপাদনে এবার খরচ পড়েছে ২১ টাকা ৫৫ পয়সা। সেটা বিবেচনা করে তারা ধানের দাম কেজিতে ২৬ টাকা নির্ধারণ করেছে, যাতে কৃষকের কিছুটা লাভ থাকে।

Be the first to comment