মাথায় হাত ড্রাগন ফল চাষিদের

ভরা মৌসুমেই ড্রাগন ফলের চাহিদা একেবারে তলানিতে চলে এসেছে লকডাউনের কারণে । ৫০০ টাকা কেজির এই অপ্রচলিত ফল বর্তমানে ১০০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে।

ড্রাগন ফল সংগ্রহের এই পূর্ন মৌসুমে শহর এলাকায় কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে, পরিবহনসংকটও চলছে। ফলে বেচাকেনা ও দাম দুটোই ব্যাপকভাবে কমেছে। ৫০০ টাকা বা তারও বেশি দামের ড্রাগন ফল এখন মাত্র ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করতে হচ্ছে। যে কারণে নাটোরের ড্রাগন ফলচাষিরা বড় লোকসানের মুখে পড়েছেন। সব মিলিয়ে লোকসানের পরিমাণ প্রায় ২৬ কোটি টাকা হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

নাটোর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরে এই জেলার ৩০০ বিঘা (৪০ হেক্টর) জমিতে ড্রাগন ফলের চাষ হয়েছে। এতে ৬৪০ মেট্রিক টন ফল উৎপাদন হওয়ার কথা। ৫০০ টাকা কেজি দরে হিসাব করলে ঐ ড্রাগন ফলের দাম দাঁড়ায় ৩২ কোটি টাকা। অথচ ফলচাষিরা এখন বিভিন্ন আড়তে মাত্র ১০০ টাকা কেজি দরে ড্রাগন ফল বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। তাও আবার ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না। এই দরে সব ফল বিক্রি হলে তাতে চাষিদের ক্ষতি হবে ২৫ কোটি ৬০ লাখ টাকার মতো। এতে পুরোনো ফলচাষিদের পাশাপাশি নতুনরাও পুঁজি হারাতে পারেন।

নাটোরে জুনের মাঝামাঝি সময়ে বাগান থেকে ড্রাগন ফল সংগ্রহ শুরু হয়। কিন্তু একই সময়ে দেশের প্রায় সব বড় বড় শহরে কঠোর লকডাউন বা বিধিনিষেধ বলবৎ হয়। ফলে শহরগুলোয় ফলের দোকানে বিক্রি কমে গেছে। এর ওপর বিধিনিষেধের কারণে ঢাকার সাথে নাটোর ও রাজশাহীর সরাসরি বাস ও ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। এ কারণে শহরে ড্রাগন ফল পাঠানো যাচ্ছে না। আবার সবার পক্ষে ট্রাক ভাড়া করে ড্রাগন ফল পাঠানোও কঠিন।

নাটোরের সবচেয়ে বড় ড্রাগন ফল চাষি হিসেবে পরিচিত গোলাম নবী। এবার সদর উপজেলার মাঝদিঘা গ্রামে তিনি ৩০ বিঘা জমিতে ড্রাগন ফলের চাষ করেছেন, যেখানে রয়েছে প্রায় ১৪ হাজার ড্রাগনগাছ। গোলাম নবী জানান, তিনি ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বড় বড় শহরের ফলের আড়তে ড্রাগন বিক্রি করে থাকেন। কিন্তু চলাচলে বিধিনিষেধ থাকায় ভরা মৌসুমে শহরের আড়তদারেরা ড্রাগন ফল নিতে চাচ্ছেন না। তাঁদের দাবি, তাঁরা খুচরা ক্রেতা পাচ্ছেন না।

গোলাম নবী আরও বলেন, বিক্রি করতে না পারলে কয়েক দিনের মধ্যেই ড্রাগন ফল পচে কিংবা শুকিয়ে যায়। তা ছাড়া নাটোরে ড্রাগন সংরক্ষণের মতো কোনো কোল্ডস্টোরেজ বা হিমাগার নেই। ফলে আড়তদারেরা যে দর বলছেন তাতেই ফল বিক্রি করতে হচ্ছে। কখনো কখনো প্রতি কেজি ড্রাগন ১০০ টাকারও কম দরে বিক্রি করতে হয়। অথচ প্রতি কেজি ২০০ টাকার নিচে বিক্রি করলে উৎপাদন খরচই উঠবে না।

আহম্মদপুর এলাকার ড্রাগন ফলচাষি

মো. সেলিম রেজা জানান, তিনি ১৫ বছর ধরে ড্রাগন ফলের আবাদ করছেন। কিন্তু ফল বিক্রি নিয়ে এবারের মতো কখনো এত মুশকিলে পড়েননি। ঢাকার সঙ্গে সরাসরি বাস-ট্রেন বন্ধ থাকায় ব্যবসায়ীরা ঠিকমত ফল পাঠাতে পারছেন না। এতে দাম অস্বাভাবিক কমে গেছে। ৫০০ টাকা কেজির ফল এখন ১০০ টাকা বা তারও কম দরে বিক্রি করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, ড্রাগন পাকা শুরু করলে গাছে রাখা যায় না। পচে নষ্ট হয়ে যায়। এ ছাড়া ইঁদুর ও কাঠবিড়ালের উপদ্রব রয়েছে।

সেলিম রেজা আরও বলেন, বৃহস্পতিবার থেকে বিধিনিষেধ আরও কঠোর হওয়ায় ঢাকার আড়তদারেরা ফোন করে ড্রাগন পাঠাতে নিষেধ করছেন। এ অবস্থায় সরকার ড্রাগন ফলচাষিদের ভর্তুকি না দিলে অপ্রচলিত ও দামি এই ফলের আবাদ ছেড়ে দিতে বাধ্য হবেন। তখন আগের মতো বিদেশ থেকে এই ফল আমদানি করতে হবে। এতে বাজারে দাম অনেক বেড়ে যাবে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয়ের উপপরিচালক সুব্রত কুমার বলেন, ড্রাগন অপ্রচলিত ও দামি ফল হওয়ায় এর অধিকাংশ ক্রেতা শহরের। বিধিনিষেধের কঠোরতাও মূলত শহরকেন্দ্রিক। ফলে ড্রাগনচাষিরা চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তাই বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ে লিখিতভাবে জানানো হবে।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*