খুলনা অঞ্চলের কৃষক দীর্ঘদিন ধরে ঘেরের পাড়ে বছরব্যাপী নানান জাতের সবজি চাষ করছেন।গত কয়েক বছর এলাকায় ঘেরের পাড়ের মাচায় অসময়ের তরমুজ চাষও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এবার সেই তালিকায় যোগ হয়েছে মরু অঞ্চলের ফল রকমেলন।
এই ফলের চাষ করেছেন ডুমুরিয়া উপজেলার পাঁচপোতা গ্রামের দুই ভাই ইলিয়াস মোল্লা ও আফজাল মোল্লা। প্রথমবারের মতো ঘেরের আইলে পরীক্ষামূলকভাবে চাষে সফলতা এসেছে। এখন ফল পাকতে শুরু করেছে। এই ফল বিক্রি হয় দেশের বিভিন্ন সুপারশপে।
কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মরুপ্রধান দেশের জনপ্রিয় ফল রকমেলন। আরব অঞ্চলের মানুষ একে সাম্মাম নামেই জানে। এ ছাড়া বিভিন্ন দেশে ফলটি খরমুজ, খরবুজ, সুইট মেলন, কেন্টালোপ, নেটেড মেলন নামেও পরিচিত। কয়েক রকম জাত আছে এই বিদেশি ফলটির।সংরক্ষণ ও পরিবহনে সুবিধা রয়েছে, ফলটির খোসা বেশ পুরু হওয়ার দরুন।
গত শুক্রবার পাঁচপোতা গ্রামের ওই ঘেরের পাড়ে গিয়ে, ঘের টলটলে পানিতে ভরা অবস্থায় দেখা যায়। মাচা বানানো হয়েছে এর আইলের ধার দিয়ে। নানা জাতের অসংখ্য তরমুজ ঝুলছে বাঁশ ও নাইলনের সুতা দিয়ে তৈরি সেই মাচাতে। সেগুলো বেঁধে রাখা আছে নেটের ব্যাগ দিয়ে। এক পাড়ের একটা অংশজুড়ে তরমুজের মতো মাচায় ঝুলছে রকমেলন। কুমড়াগাছের মতো লতানো গাছ। দুই ভাই পানিতে নেমে মাচা উঁচু করে দিচ্ছেন। সঙ্গে চলছে অন্যান্য পরিচর্যা।
দুই ধরনের রকমেলন হয়েছে ইলিয়াসদের ঘেরের পাড়ে। হলুদ মসৃণ খোসা একটির গায়ে। পেঁপের মতো খানিকটা। আর অন্যটির রং হালকা বাদামি ধূসর, খোসা খসখসে। ছোট গোল কুমড়া বা বড় বাতাবিলেবুর আকারের। দুই জাতেরই ফলের ভেতরটা অনুজ্জ্বল কমলা বর্ণের। অনেকটা বাঙির মতো ভেতরের অংশটা। তবে দুটি ফলই সুগন্ধযুক্ত খেতেও খুবই মিষ্টি ও সুস্বাদু।
চাষি আফজাল মোল্লা জানান, কয়েক বছর ধরে তাঁরা নিজেদের ও বর্গা নিয়ে ঘেরের পাড়ে অসময়ের তরমুজ লাগাচ্ছেন। তাঁদের এক সন্তান থাকেন মালয়েশিয়া।তাঁরা তরমুজের পাশাপাশি সাম্মাম লাগানোর চেষ্টা করেছেন তাঁর কথায় ও কৃষি বিভাগের পরামর্শে। ঘেরের পাড়ে হয় কি না, তা পরীক্ষার জন্য মাত্র ১০ শতক জায়গায় বীজ পুঁতেছিলেন জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহে। ফলের তেমন একটা রোগবালাই নেই। গাছে সামান্য সার ও কীটনাশক দিতে হয়েছে। ঘেরের পাড়ে হওয়ায় সেচের ঝামেলাও তেমন নেই।
লাগানোর মাসখানেক পরেই গাছে ফল আসতে শুরু করে। প্রতিটা গাছে পাঁচ-সাতটা করে ফল আসে। সব মিলিয়ে ৬০-৬২ দিনের মধ্যে ফল একবারে পরিপক্ব হয়েছে। হলুদ জাতের ফল দুই থেকে আড়াই কেজি ওজনের আর খসখসে গোল জাতের ফলটা হয়েছে তিন থেকে চার কেজি ওজনের। খুলনার আড়তে ফলটির নমুনা দেখিয়েছেন। সেখানে কেজিপ্রতি ৬০-৬৫ টাকা দিতে চেয়েছে।
ঘেরের আইলে প্রথমবারের মতো বিদেশি এ ফল উৎপাদনের খবর পেয়ে দেখতে আসছেন আশপাশের কৃষকেরা। কেউ কেউ ভবিষ্যতে নতুন জাতের এ রসালো ফল উৎপাদনের জন্য পরামর্শও নিচ্ছেন। তেমনই একজন চাষি বাবলু গাজী বলেন, ‘আমি ঘেরের আইলে বিভিন্ন সবজি ও তরমুজ লাগিয়েছি। আমাদের অঞ্চলে ঘেরের পাড়ে লাগানো নতুন ফলটি কেমন হয়েছে, তা দেখতে এসেছি। বিদেশি এই ফল দারুণ হয়েছে। আগামী মৌসুমে অন্তত এক একর জায়গায় এই ফল চাষ করব।’
ডুমুরিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোছাদ্দেক হোসেন বলেন, ‘রকমেলন বা সাম্মাম ফলটি দেশের বেশ কয়েকটি এলাকার সমতল ভূমিতে চাষ হচ্ছে। তবে খুলনার মতো লবণাক্ত মাটিতে ঘেরের আইলে প্রথম এই ফল চাষে সফলতা দেখা গেছে। ডুমুরিয়ার সবজি এখন ইউরোপে যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে জনপ্রিয় এই ফলও রপ্তানির বড় সুযোগ আছে। আগামী মৌসুমে এর চাষ এই অঞ্চলে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে যাবে।’

Be the first to comment