রুটেসি পরিবারের ছোট চিরসবুজ সপুষ্পক উদ্ভিদের একটি প্রজাতি লেবু বা সাইট্রাস লিমন। এটি সাধারণত, উত্তর পূর্ব ভারত অর্থাৎ দক্ষিণ এশিয়ার একটি স্থানীয় গাছ।
মূলত এটির রসের জন্য, এই গাছের উপবৃত্তাকার হলুদ ফলটি সারা বিশ্বে রান্নার কাজ এবং রান্নার কাজ ছাড়াও বিভিন্ন উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়। রান্না ও পরিষ্কার উভয় কাজেই এটির রস ব্যবহার করা হয়। [১] লেবুর শাঁস এবং খোসাও রান্না এবং বেকিংয়ে ব্যবহৃত হয়। লেবুর রসে প্রায় ২.২ পিএইচ এর প্রায় ৫% থেকে ৬% সাইট্রিক অ্যাসিড, যার কারণে এটি টক স্বাদযুক্ত হয়। লেবুর রস টক স্বাদযুক্ত হওয়ায় এটিকে পানীয় এবং খাবার, যেমন লেবুর শরবত এবং ‘লেবু মেরিংয়ে পাইয়ের’ মূল উপাদান হিসাবে ব্যবহার করা হয়। চট্টগ্রাম অঞ্চলে লেবুকে “হঁজি” বলে। নোয়াখালীতে লেবুকে “কাগজী” বলে।
লেবু একটি জনপ্রিয় ফল যা ব্যবহারে খাবারের স্বাদে ভিন্নতা অনুভব হয়। মুখের রুচি বাড়াতে লেবুর জুড়ি নেই। বাজারে বিভিন্নরকম লেবু পাওয়া যায়। কাগজি লেবু, পাতি লেবু, গন্ধরাজ, কমলা লেবু, মোসাম্বি লেবু ও বাতাবি লেবু খুব পরিচিত আমাদের কাছে।
নিম্নে লেবুর পুষ্টিগুন ও উপকারিতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলোঃ
লেবুতে ভিটামিন এ, ভিটামিন বি 6, ভিটামিন সি, ভিটামিন ই, ফসফরাস, ফোলেট, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, পটাসিয়াম, প্যানটোথেনিক অ্যাসিড, আয়রন, দস্তা, তামা, নিয়াসিন থায়ামিন এবং আরও অনেক প্রোটিন রয়েছে। স্বাস্থ্যের জন্য খুব উপকারী এই পুষ্টিগুলি।
১০০ গ্রাম কাগজি বা পাতিলেবু থেকে যে সব পুষ্টি উপাদান পাওয়া যায়; ভিটামিন সি ৬৩ মিলি গ্রাম যা আপেলের ৩২ গুণ ও আঙ্গুরের দ্বিগুণ (ভিটামিন-সি সুস্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য যার অভাবে শরীরে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে), ক্যালসিয়াম ৯০ মিলি গ্রাম, ভিটামিন এ ১৫ মাইক্রোগ্রাম, ভিটামিন বি ১৫ মিলি গ্রাম, ফসফরাস ২০ মিলি গ্রাম, লৌহ ৩ মিলি গ্রাম।
বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানের রয়েছে সমারোহ লেবুতে, যা শরীরকে বিভিন্ন ক্যান্সারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
প্রাত্যহিক জীবনে আমরা লেবু, কম বেশি সকলেই খেয়ে থাকি। এটি সাধারণত ব্যবহার করা হয় খাবারের স্বাদ বাড়ানোর ক্ষেত্রে। আবার এটির আচার তৈরি করেও খেয়ে থাকেন অনেকে। আকারে ছোট ফল লেবু। তবে পুষ্টিগুণে ভরপুর আর এর উপকারিতাও প্রচুর।
আসুন জেনে নিন লেবুর অসাধারণ কিছু উপকারিতাঃ-
ক্যান্সার প্রতিরোধ করে
বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানের সমারোহ রয়েছে লেবুতে, যা শরীরকে বিভিন্ন ক্যান্সারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করে। নিয়মিত লেবু খাদ্যতালিকায় রেখে আমারা ক্যান্সারের হাত থেতে রক্ষা পেতে পারি।
পাকস্থলীকে সুস্থ রাখে
তাদের জন্য লেবু আদর্শ টনিক যারা পেটের গোলযোগে ভুগছেন। পেটের গোলযোগের মধ্যে বদহজম, ডায়রিয়া, কোষ্টকাঠিন্য, আমাদের অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। আপনাকে এই যন্ত্রনা থেকে মুক্তি দেবে, শুরুতে এক গ্লাস লেবু+লবন পানি। লেবুর সাথে এক চা চামচ মধু যুক্ত হলে ভাল হয় আরও।
ফুসফুসের জন্য ভাল
লেবু শরীর থেকে বিষাক্ত দ্রব্য বের করে দেয় এবং ফুসফুসের যত্ন নেয়। লেবু শরীরের লিপিড ও চর্বির মাত্রা কম রাখে।
ক্ষত সারায়
শরীরের রোগ প্রতিরোধী ক্ষমতা বৃদ্ধি করে লেবুর উচ্চ ভিটামিন যা যে কোন ভাইরাস জনিত ইনফেকশন যেমন ঠান্ডা, সর্দি, জ্বর দমনে লেবু খুব কার্যকারী, মুত্রনালীর ক্ষত সারাতেও লেবুর গুরুত্ব রয়েছে।
রক্তচাপ বা হাইপার টেনশন কমায়
তারা সহজেই নান রকম হৃদরোগে আক্রন্ত হয়ে পড়ে, যারা খাবারে যথেষ্ট পটাশিয়াম গ্রহণ করে না। লেবুর রসে থাকা পটাশিয়াম হাইপার টেনশন কমাতে সাহয্য করে।
ত্বকের যত্নে
লেবুর জুড়ি নেই, প্রাকৃতিক পরিষ্কারক হিসাবে। ত্বকের লাবণ্য ধরে রাখতে সাহায্য করে এটি। ত্বকের সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়, মধুর সাথে লেবুর রস মিশিয়ে ব্যবহার করলে। ত্বকের সংকোচন সৃষ্টিকারী পদার্থকে এটি নিয়ন্ত্রণে রাখে। চামড়ার অতিরিক্ত তেল অপসারণ করে। লেবুর রস প্রাকৃতিক অ্যানটি সেপটিক। ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ দূর করে। ব্রণ সারিয়ে তোলে, ত্বকের রং উজ্জ্বল করে। বয়সের বলিরেখা দূর করে।
দাদ ও চুলকানির জন্য
লেবুর রস লাগান দাদ বা চুলকানির সমস্যা দূর করতে। মুক্তি পাবেন দাদ এবং চুলকানির সমস্যা থেকে।
মুখের দুর্গন্ধ দুর করে
দাঁতের সমস্যা, মাড়ির ব্যথা, মুখের দুর্গন্ধ দূর করে। দাঁত ব্রাশ করার প্রয়োজন নেই লেবুর পানি খাবার পর।
দাঁতের হলুদভাব দূর করে
লেবু কেটে, লেবুর টুকরো করে নুন লাগিয়ে দাঁতে ঘষুন এবং দাঁতে ঘষলে দাঁতগুলির কুঁচক দূর হবে এবং আপনার দাঁত আগের মতো সাদা এবং চকচকে হয়ে উঠবে।
নখকে সুন্দর করে
নখ তার বিবর্ণতা থেকে উজ্জল রং ফিরে পায়, এক টুকরা লেবু দিয়ে নখ পলিশ করলে। লেবুর পানিতে হাত-পা ডুবিয়ে রাখলেও উপকার হয়।
ওজন কমাতে
নিয়মিত ফ্রেশ লেবুর জুস+পানি খেলে ধীরে ধীরে ওজন কমাতে সাহয্য করবে। লেবুতে থাকা পেকটিন ফাইবার খিদে কমাতে সাহায্য করে। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা খালি পেটে লেবুর রস খান, দ্রুত হ্রাস পায় তাদের ওজন। সুতরাং প্রতিদিন সকালে লেবুর রস খান, ওজন বৃদ্ধি নিয়ে চিন্তা না করে।
পিএইচ মাত্রা নিয়ন্ত্রণ
শুনলে অবাক হতে হয়, লেবু শরীরে প্রয়োজনে ক্ষারধর্মী আচরণ করে, অম্লীয় হওয়া সত্ত্বেও। শরীরে এসিডিটি তৈরি করে না এটি । শরীরের পিএইচ মাত্রাকে সঠিক অবস্থায় রাখে লেবু। পিএইচ মাত্রা ঠিক থাকে, লেবুর রস+লবণপানি পান করলে।
গর্ভবতী নারীদের সুস্থতায়
লেবুপানি খুবই ভালো গর্ভবতী নারীদের জন্য। এটা গর্ভবতী এবং গর্ভের শিশু উভয়েরই শরীরের অনেক বেশি উপকার করে। লেবুর পটাশিয়াম ও ভিটামিন সি শিশুর হাড়, মস্তিষ্ক ও দেহের কোষ গঠনে সহায়তা করে।
শ্বাসকষ্ট নিরাময়ে
নিয়ম করে খাবারের আগে এক চামচ লেবুর রস খেতে পারেন, যাদের হালকা শ্বাসকষ্ট আছে। লেবুর রস তাদের জন্য ওষুধের বিকল্প হিসেবেই কাজ করবে, যারা কিনা মাইল্ড অ্যাজমায় ভুগছেন। হাঁপানি সমস্যার উপশম করে ফুসফুস পরিষ্কার করার মাধ্যমে।
বয়সের ছাপ দূর করে
বলিরেখার মাধ্যমে বয়সের ছাপ পড়ে। তাছাড়া এমনিতেই বলিরেখা পড়তে পারে অনেকের। এই বলিরেখা দূর করতে দারুণ কার্যকর লেবুর রস। রেখাগুলোতে ১৫ মিনিট লেবুর রস দিয়ে রাখুন ও ধুয়ে ফেলুন।
শক্তি বৃদ্ধি করে
লেবুর রস শরীরে শক্তি বৃদ্ধি করে, পরিপাক নালীতে প্রবেশ করার মাধ্যমে।
মানসিক চাপ কমায়
এটি সহায়ক ভূমিকা পালন করে, মানসিক চাপ কমিয়ে মেজাজ ফুরফুরা করতে।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়
সর্দি-কাশির সমস্যা দূর করে লেবুর মধ্যে থাকা প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন সি। মস্তিষ্ক ও স্নায়ুর ক্ষমতা বাড়ায়।
কিডনির পাথর দূর করে
কিডনিতে ‘ক্যালসিয়াম অক্সালেট’ নামক পাথর গঠনে বাধা দেয় লেবুতে উপস্থিত সাইট্রিক অ্যাসিড। এটি সাধারণ কিডনি পাথরগুলোর মধ্যে একটি।
লিভার ভাল রাখে
লেবুতে বিদ্যমান সাইট্রিক অ্যাসিড কোলন, পিত্তথলি ও লিভার থেকে অপ্রয়োজনীয়, ক্ষতিকারক বর্জ্য পদার্থ বের করতে সাহায্য করে। ফলে ইউরিনেশন ভাল হয়। লিভার ভাল থাকে।
ভাইরাসজনিত সংক্রমণ প্রতিরোধ করে
ভাইরাসজনিত সংক্রমণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে লেবুর রস।
মূত্রনালীর সংক্রমণ দূর করে
যদি সংক্রমণ ঘটে মূত্রনালীতে, তাহলে লেবুর রস পান করুন প্রচুর পরিমাণে। এটি সাহায্য করবে আরোগ্য লাভে।
চোখের স্বাস্থ্য ভাল রাখে
লেবুর রস চোখের সমস্যার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে ও চোখের স্বাস্থ্যকে নিয়ন্ত্রণ করে।
তাছাড়া লেবু দেহের ক্যালমিয়াম শোষন করে খুব সহজেই, এতে ভরপুর ভিটামিন সি থাকায়। ফলে বজায় থাকে হাড়ের গঠন ও দৃঢ়তা।

Be the first to comment