যেভাবে চাষ করবেন শীতকালীন টমেটো

আমাদের দেশে টমেটো একটি সুস্বাদু সবজি। এটি সালাদ হিসেবে বেশ জনপ্রিয়। টমেটো পুষ্টি গুণে ভরা একটি সবজি। ভিটামিন এ এবং ভিটামিন সি-এর অন্যতম উৎসও বটে এই সবজিটি। এছাড়া এতে আছে বেটা কেরোটিন নামক এক প্রকার ভিটামিন যা রাতকানা রোগ থেকে রক্ষা করে। তাই চিকিৎসকরা সুস্বাস্থ্য রক্ষার জন্য টমেটো খাওয়ার পরামর্শ দেন। তাই আমাদের টমেটোর চাহিদা পূরণের জন্য উদ্যোগী হতে হবে। এবার জেনে নিন শীতকালীন টমেটো চাষ করার পদ্ধতি।

শীতকালীন টমেটো চাষের জন্য কার্তিক মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে তৃতীয় সপ্তাহ (অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ থেকে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ ) পর্যন্ত বীজতলায় রোপনের উপযুক্ত সময়। বীজ রোপন করতে হবে এই সময়ের মধ্যেই।

আমাদের দেশের প্রায় সব ধরনের মাটিতেই চাষ করা যায় টমেটো। তবে সবচেয়ে উপযোগী বেলে দোঁ-আশ মাটি। জমি চাষ শেষ হলে ড্রেনের ব্যবস্থা রাখতে হয় ভূমি হতে ১০-১৫ সে.মি. উঁচু বেড তৈরি করে বেডের চারপাশে। চারা লাগানোর সঙ্গে সঙ্গে পানি দিতে হবে। সারি থেকে সারির দূরত্ব হবে ৫০ সে.মি. এবং চারা হতে চারার দূরত্ব হবে ৫০ সে.মি.।

বপন করতে হবে ভালো জাতের টমেটোর বীজ। এ জাতের মধ্যে রয়েছে বাহার, বারি টমেটো-৩, ৪, বিনা টমেটো-৪, বিনা টমেটো-৫। অন্যদিকে হাইব্রিড এর মধ্যে মিন্টু, সবল ও বারি টমেটো-৫ বেশ ভালো জাতের। এই জাতের টমেটোর বীজের গাছ অধিক ফলন দিচ্ছে।

জমিতে তিন চারটি চাষ ও মই দিয়ে সাধারণভাবে জমি তৈরি করতে হয়। শেষ চাষের আগে নির্ধারিত পরিমাণ গোবর সারের অর্ধেক এবং পুরো টিএসপি সার ছিটিয়ে দিয়ে পুনরায় চাষ ও মই দিয়ে জমি তৈরি করতে হবে। বাকি অর্ধেক গোবর চারা লাগানোর সময় গোড়ায় মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে।

সমান দুই ভাগ করে ইউরিয়া ও পটাশ চারা লাগানোর ১৫ দিন এবং ৩৫ দিন পর প্রয়োগ করতে হবে। একর প্রতিবোরন ১-২ কেজি,  জিপসাম ২০-৩০ কেজি, টিএসপি ৬০-৮০ কেজি, এমপি ৬৮-৯২ কেজি, ইউরিয়া ৮০-১০০ কেজি এবং ৪ টন গোবর প্রয়োগ করতে হবে।

পানি সেচ দেয়া প্রয়োজন শুষ্ক মৌসুমে চাষ করলে। তিনবার সেচ দেয়া যেতে পারে ফসল ও মাটির অবস্থা বিবেচনা করে।

জমির অবস্থা বুঝে হালকাভাবে ঝরনা দিয়ে গাছে পানি দিতে হবে। চারা লাগানোর পর আগাছা দেখা দিলে নিড়ানি দিয়ে জমির মাটি ঝুরঝুর করে দিতে হবে এবং হালকাভাবে আগাছাগুলো পরিষ্কার করে ফেলতে হবে। ভালো ফলন ও নিখুঁত ফল পেতে টমেটো গাছে ঠেকনা দেয়া প্রয়োজন।

টমোটোর ফলন বৃদ্ধি পায় পাশাপাশি দুইটি সারির মধ্যে ‘অ’ আকৃতির বাঁশের ফ্রেম তৈরি করে দিলে। প্রয়োজনে অতিরিক্ত ডালপালা ছাঁটাই করা উচিত, গাছ যাতে অত্যধিক ঝোপালো না হয় সে জন্য। প্রথম ও দ্বিতীয় কিস্তির সার প্রয়োগের আগে পার্শ্বকুশি ছাঁটাই করে দিতে হয়। এতে পোকামাকড় ও রোগের আক্রমণ কম হয় এবং ফলের আকার ও ওজন বৃদ্ধি পায়। নিড়ানি দিয়ে জমি আগাছামুক্ত রাখতে হবে।

টমেটোর ভালো ফলনের জন্য পোকামাকড় ও রোগ দমনের দিকেও নজর দিতে হবে। টমেটো ছিদ্রকারী পোকার জন্য ৫ শতাংশ জমিতে ১০ লিটার পানিতে সবিক্রন ৪২৫ ইসি ২০ মি.লি.মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। কোনো কোনো ক্ষেতে কৃমি রোগ, গোড়া পচা রোগ দেখা যায়। সে ক্ষেত্রে জমিতে চারা লাগানোর আগে ফুরাডন-৩ জি দিয়ে মাটি শোধন করে নিলে এ সব রোগের প্রকোপ কমে যায়। ঠিকমত পরিচর্যা করলে হেক্টরপ্রতি প্রায় ৭০- ৯০ টন পর্যন্ত ফলন হতে পারে।

ফলগুলো যাতে নরম হয় সেজন্যে জমি থেকে পাকা ফল তুলে ঘরে রাখতে হবে ২-৩ দিন। নরম হওয়ার পর দুই ভাগে কেটে বীজগুলো একটি শুকনো প্লাস্টিকের অথবা কাচের পাত্রে ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা রেখে দিতে হবে। এরপর বীজগুলো পরিষ্কার পানি দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে রোদে শুকিয়ে কাচ বা প্লাস্টিকের পাত্রে মুখ ভালোভাবে বন্ধ করে সংরক্ষণ করতে হবে।

জাতভেদে চারা লাগানোর ৬০ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে শুরু করা যায় পাকা টমেটো সংগ্রহ। টমেটো কাঁচা ও পাকা উভয় অবস্থাতেই সংগ্রহ করা যায়। প্রতি গাছ থেকে টমেটো সংগ্রহ করা যায় সাত থেকে আটবার।

ফসল সংগ্রহের উপযোগী হয় ফলের নিচের দিকে একটু লালচে ভাব দেখা দিলে। টমেটোর ফলন শতাংশে ৮০ থেকে ১০০ কেজি পর্যন্ত হতে পারে জাতভেদে। বেশ ভালো ফলন পাওয়া যাবে এভাবে নিয়ম মেনে টমেটো চাষ করলে।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*