শীত এলে মাছ চাষিরা বিভিন্ন সমস্যায় পড়েন খামারের মাছ নিয়ে। মাছ খাদ্য গ্রহণ অনেকটা কমিয়ে দেয় ঠান্ডার ফলে। এর প্রভাবে পুকুরে অ্যামোনিয়ার মাত্রা বৃদ্ধি পায় অতিরিক্ত খাদ্য পচে গিয়ে। সেই সঙ্গে অভিস্রবণ প্রক্রিয়ার ফলে পানিতে প্রয়োজনীয় অক্সিজেনের অভাব দেখা দেয় এবং সর্বোপরি মাছের মৃত্যু ঘটে।
মাছ তাদের চলাচল কমিয়ে দেয় আবদ্ধ পুকুরের ঠান্ডা পানিতে। যার ফলে মাছের ক্ষুধা এবং মেটাবলিজম কমে যায়। অন্যদিকে বিভিন্ন ধরনের রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ে পানি ঠান্ডা থাকায়। রোদ অল্প সময় পুকুরের পানিতে পড়ে দিন ছোট হওয়ার কারণে। ফলস্বরূপ পুকুরের পানির তাপমাত্রা কমে যায়।
সাধারণত তাপমাত্রা ২৮-৩২ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড হলে মাছের মেটাবলিজম বা পরিপাক ভালো হয়। এর কম হলে পরিপাক ক্রিয়া কমে যাওয়ায় বৃদ্ধির হার কমে যায়।
অন্যদিকে সূর্যের আলো কম পাওয়ায় প্রাকৃতিক অক্সিজেন উৎপাদন কমে যায়। ফলে মাছের শ্বাসকার্য চালাতে কষ্ট হয়। মাছ খাবি খেতে শুরু করে। তাই অক্সিজেনের অভাবে মাছের মৃত্যু ঘটে।
তাছাড়া পানিতে দ্রবীভূত কার্বনডাই অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যায় পুকুরের পানিতে অবস্থিত ফাইটোপ্লাঙ্কটন তৈরির প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ায়। এর ফলেও মাছের অসুবিধা হয় শ্বাস নিতে।
প্রাকৃতিক খাদ্যকণা যেমন উদ্ভিদকণা বা ফাইটোপ্লাংটন ও প্রাণিকণা বা জুপ্লাংটন কমে যাওয়ায় স্বল্পতা দেখা দেয় মাছের খাবারে। এর ফলে হ্রাস পায় দৈহিক বৃদ্ধি।
পানির পিএইচ স্বাভাবিক থাকে না শীতকালে। স্বাভাবিক পিএইচের মান ৬-৮ এর মধ্যে থাকা উচিত মাছের বৃদ্ধির জন্য। পানি বেশি অম্লীয় হয়ে যাবে যদি পিএইচ ৬ এর থেকে কম হয়, ফলে মাছ খাবার খেতে অনীহা দেখাবে। আবার পানি ক্ষারীয় হবে পিএইচ ৮ এর থেকে বেশি হয়ে গেলে, ফলে অতিরিক্ত ক্ষারত্বের কারণে মাছ মারা যেতে পারে।
শীত মৌসুমে মাছে বিভিন্ন ধরনের ফাঙ্গালজনিত, ব্যাকটেরিয়ালজনিত এবং পরজীবীজনিত রোগ দেখা যায়।
এসময় সঠিকভাবে মাছের পরিচর্যা না করলে মাছের অপুষ্টিজনিত রোগ (চোখ অন্ধ হওয়া, হাড় বাঁকা), উঁকুন রোগ, ক্ষতরোগ, ফুলকা পচা রোগ, লেজ ও পাখনা পচা রোগ এবং উদর ফোলা রোগে আক্রান্ত হয়ে মাছ মরে যেতে পারে।
শীতকালে মাছের খামারের পরিচর্যা
যথাসম্ভব পরিষ্কার রাখতে হবে পুকুরের পাড়ের উঁচু গাছপালা। যাতে পুকুরে পর্যাপ্ত সূর্যের আলো পড়ে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত। পানিতে অক্সিজেনের বৃদ্ধি ঘটাতে হবে কৃত্রিম উপায়ে।
সাঁতার দিয়ে, জাল টেনে এবং বাঁশ দিয়ে পিটিয়ে পানিতে অক্সিজেনের বৃদ্ধি ঘটাতে হবে আর পুকুর বা ঘের বড় হলে কৃত্রিম অক্সিজেন ট্যাবলেট যেমন-এসআই অক্সিট্যাব প্রতি একরে ৪ থেকে ৫ কেজি সন্ধ্যায় প্রয়োগ করা যেতে পারে।
স্বাস্থ্য, মাছের সংখ্যা ও ওজন সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যাবে প্রতি ১০-১৫ দিন অন্তর পুকুরে জাল টানলে। এছাড়া পুকুরের তলদেশের বিভিন্ন ক্ষতিকারক গ্যাস বের হয়ে যাবে জাল টানার ফলে।
প্রয়োজনে এসআই এমোফ্রি-এল অথবা এসআই এমোফ্রি-পি প্রতি শতাংশে ৫ মিলিলিটারের সাথে ২০ মিলিলিটার করে চিটাগুর প্রয়োগ করতে হবে ক্ষতিকর গ্যাস অ্যামোনিয়ার প্রভাবে মাছ মারা গেলে।
ময়লা-আবর্জনা, অতিরিক্ত শ্যাওলা, কচুরিপানা, আগাছাসহ সব ক্ষতিকর জলজ উদ্ভিদ পরিষ্কার করতে হবে।
পুকুরে প্রতি একরে ৬-৭ কেজি এসআই বায়োজিও প্লাস প্রয়োগ করতে হবে পুকুরের পানির পিএইচ ৬-৮ এর মধ্যে রাখতে শীতের শুরুতে ১৫ থেকে ২০ দিন বা একমাস অন্তর অন্তর।
প্রতি একরে ২ লিটার ভিনেগার বা এসিডিন নামের এসিডিফায়ার প্রয়োগ করতে হবে পিএইচের মান অতিরিক্ত বৃদ্ধি পেলে। এসআই রয়েল জিও প্রতি একরে ১৫-২০ কেজি প্রয়োগ করতে হবে পিএইচ একেবারে কমে গেলে।
অজৈব সার বিশেষ করে ইউরিয়া (বিঘা প্রতি মাসে ৪-৫ কেজি) ও ট্রিপল সুপার ফসফেট (বিঘা প্রতি মাসে ৫-৬ কেজি) ৩ দিন ভিজিয়ে রেখে প্রয়োগ করতে হবে পুকুরে উদ্ভিদকণা বৃদ্ধির জন্য। এছাড়াও কড়া রোদের সময় এসআই ফাইটোগ্রো একর প্রতি ৩-৪ লিটার প্রয়োগ করা যেতে পারে।
শীতের সময় মাছের সুষম বৃদ্ধি বজায় রাখতে মূল খাবারে মাছের হজমশক্তি বাড়ানোর জন্য প্রতি কেজি খাদ্যের সাথে উৎকৃষ্টমানের উৎসেচক বা এনজাইম সমৃদ্ধ গ্রোথ প্রমোটর যেমন-এসআই গ্রোফিস প্রয়োগ করা উচিত। এতে বাড়বে মাছের খাবারের চাহিদা। তার সাথে অবশ্যই প্রতিকেজি খাদ্যের সাথে ভালোমানের ইমিউনোমডুলেটর জেলি যেমন-এসআই রয়েল জেল ১০ মিলিলিটার করে মিশিয়ে ১৫-২০ দিন টানা খাওয়াতে হবে।
শীতকালে সাধারণত পুকুরের পানি কমে যায়। তাই প্রয়োজনমতো পানির সরবরাহ বজায় রাখতে হবে। মাছের ঘনত্ব কম বা স্বাভাবিক অবস্থায় রাখতে হবে।
পানি পরিবর্তন করতে হবে যদি পুকুরের পানি বেশি দূষিত হয়ে যায়। প্রয়োজনে ভালো মানের দানাদার সয়েল পোবায়োটিক যেমন-এসআই প্রোক্লিন ৬-৮ গ্রাম করে সরাসরি পানিতে ছিটিয়ে দিতে হবে পানি দূষণ রোধ করার জন্যে।
প্রয়োজন বশত ভালো মানের জীবাণুনাশক (এসআই ক্লোর-টি) ১টি করে ট্যাবলেট প্রতি শতাংশে এবং কপার সালফেট পেন্টাহাইড্রেট-১০% (এসআই ফাইটোক্লিন) ৩০ মিলিলিটার করে প্রতি শতাংশে প্রয়োগ করতে হবে।
শীতের পুরো সময়ে পানির গুণগত মান ধরে রাখতে ১৫ দিন পরপর প্রতি একর পানিতে একটি উৎকৃষ্ট মানের ওয়াটার প্রোবায়োটিক যেমন-এসআই রয়েল প্রো ৫০০ গ্রামের সাথে ২ কেজি লাল চিনি পরিষ্কার পানির সাথে মিশিয়ে প্রয়োগ করতে হবে।

Be the first to comment